চাঁদপুর প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠার ইতিকথা :
চাঁদপুরে সাংবাদিকতার সূচনা হয় ১৯৪৬ সালে। তখন চাঁদপুরে একমাত্র স্বীকৃত সাংবাদিক ছিলেন চাঁদপুর কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আজিমউদ্দিন। তিনি তৎকালীন সময়ে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদের চাঁদপুর সংবাদদাতা ছিলেন। জনাব মুহাম্মদ আজিম উদ্দিনের উৎসাহে ১৯৫১ সালে জনাব আবদুল খালেক চৌধুরী সাংবাদিকতায় এগিয়ে আসেন। তিনি এপিপি ও দৈনিক আজাদের চাঁদপুর সংবাদদাতা ছিলেন।
সে সময় সাংবাদিকতা করতে তেমন কেউ উৎসাহিত হতেন না। তবে জনাব আবদুল খালেক চৌধুরীর উৎসাহে ষাট দশকে ক’জন সাংবাদিকতায় এগিয়ে আসেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সর্বজনাব তাজুল ইসলাম চৌধুরী, মুসা কাজেম নূরী, হাসান ইমাম, শঙ্কর চন্দ্র দে, মোহাম্মদ হোসেন খান, মোস্তফা কামাল খান ও মুনসুর আহমেদ খান। এরপর ১৯৬৯ সালে জনাব কামরুজ্জামান চৌধুরী, অধ্যাপক জালাল উদ্দিন আহাম্মদ ও জনাব জাকারিয়া মিলন সাংবাদিকতায় আসেন। ওই সময়ে চাঁদপুরে সাংবাদিক সমিতির একটি শাখা প্রতিষ্ঠা করা হয়। জনাব আবদুল খালেক চৌধুরী সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ও জনাব হাসান ইমাম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। তাঁদের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে চাঁদপুরে প্রেস ক্লাব গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এর ফলে ১৯৭০ সালে চাঁদপুর প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তখন কুমিল্লা জেলার তৎকালীন জেলা প্রশাসক জনাব কাজী আজহার আলীর প্রচেষ্টায় চাঁদপুর শহরের জেএম সেনগুপ্ত রোডের ‘মাধব ভবন’ নামে একটি পরিত্যক্ত বাড়ির (বর্তমান শিল্পকলা একাডেমি) তৃতীয় তলায় প্রেস ক্লাবের জন্যে একটি কক্ষ বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু ভবনটি জরাজীর্ণ হওয়ায় তা’ ব্যবহারের অনুপযোগী ছিলো। সে সময়ে তৎকালীন সাংবাদিকরা তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে চাঁদপুর পৌরসভার সামনে অবস্থিত ‘সুইট হোমে’র একটি কেবিনকে ব্যবহার করতেন। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সুইট হোমটি পাক সেনারা ভেঙ্গে ফেললে ১৯৭১-এর পর তৎকালীন পৌর টাউন হলের নিচতলায় জনাব ফারুকী সাহেবের কাপড়ের দোকানের পেছনে একটি বিশ্রামাগারে প্রেসক্লাবের কার্যক্রম চলে। এরপর প্রেস ক্লাবের কার্যক্রম চলতো জনাব আবদুল খালেক চৌধুরীর বাসভবনে (শহরের বর্তমান আঃ করিম পাটওয়ারী সড়ক, সাবেক কুমিল্লা রোডস্থ খাজা ভবনে)। তখন চাঁদপুর প্রেস ক্লাব বলতে জনাব আবদুল খালেক চৌধুরীর বাসভবনই পরিচিত ছিলো। সেখানেই সাংবাদিকদের সকল সভা অনুষ্ঠিত হতো।
চাঁদপুর প্রেস ক্লাব ভবন প্রতিষ্ঠা:
স্বাধীনতার পর চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা জনাব আবদুল খালেক চৌধুরী সাংবাদিকতা হতে অবসরগ্রহণ করেন। এ সময় জনাব কামরুজ্জামান চৌধুরী সাংবাদিকদের অভিভাবকত্ব শুরু করেন। তাঁর সাথে এগিয়ে আসেন জনাব মোহাম্মদ হোসেন খান, শঙ্কর চন্দ্র দে, জনাব আহছানুজ্জামান, অধ্যাপক এস এম ওবায়েদ উল্লাহ প্রমুখ। তখন থেকে শুরু হয় প্রেস ক্লাব ভবন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। অবশেষে ১৯৭৪ সালের শেষভাগে চাঁদপুর পৌর কর্তৃপক্ষ বর্তমান চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের জমি দান করে। এ জমি বরাদ্দের ব্যাপারে পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান জনাব আবদুল করিম পাটওয়ারী বিশেষ অবদান রাখেন।
১৯৭০ সালে প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠা লাভের পর ১৯৭৫ সালে প্রেস ক্লাবের প্রথম কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়। যার সভাপতি ছিলেন জনাব কামরুজ্জামান চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক মোহাম্মদ হোসেন খান। এ হিসেবে জনাব কামরুজ্জামান চৌধুরী চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ হোসেন খান প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। ১৯৭৫ সালে চাঁদপুরের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক জনাব এ.এইচ.এম ফজলুল হক চাঁদপুর প্রেস ক্লাব ভবন প্রতিষ্ঠায় সাংবাদিকদের উৎসাহিত করেন। চাঁদপুর প্রেস ক্লাব ভবন প্রতিষ্ঠাকালীন সময় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে জনাব কামরুজ্জামান চৌধুরী ও অধ্যাপক মোহাম্মদ হোসেন খান। মহকুমা প্রশাসকের উৎসাহ ও সাংবাদিকদের উদ্যমে ১৯৭৬ সালের ২০ এপ্রিল জনাব এ.এইচ.এম. ফজলুল হক চাঁদপুর প্রেস ক্লাব ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তখন ১৭৫ টাকা তহবিল নিয়ে এ সাংবাদিকগণ প্রেস ক্লাব ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন। এ সময় কয়েকজন দানশীল ব্যক্তি ও মহকুমা প্রশাসক জনাব এ.এইচ.এম. ফজলুল হক আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেন। স্বল্প সময়ের মধ্যে তখন প্রেস ক্লাবের টিনশেড ভবন নির্মাণ কাজ শেষ হয়। অবশেষে ১৯৭৬ সালের ২২ ডিসেম্বর মহামান্য রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা পরিষদের তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত উপদেষ্টা জনাব আকবর কবির আনুষ্ঠানিকভাবে চাঁদপুর প্রেস ক্লাব ভবন (টিনশেড) উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশের কয়েকজন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
প্রেস ক্লাবের বহুতল ভবন নির্মাণের যাত্রা :
চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের বর্তমান আধুনিক বহুতল ভবনের যাত্রা ১৯৯৯ সালে। তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে সময়ে চাঁদপুরে আসলে তাঁর সাথে প্রেস ক্লাব নেতৃবৃন্দ সার্কিট হাউজে গিয়ে দেখা করেন। প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দ তাঁর কাছে প্রেসক্লাবের উন্নয়নের জন্যে আবেদন করলে তখন তিনি ২ লক্ষ টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে এই বরাদ্দের টাকা দিয়েই টিনশেড ভবনটি ভেঙ্গে বহুতল ভবনের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। তখন টিনশেড ভবনের জায়গায় নিচতলার একাংশের কাজ হয়। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চাঁদপুর সফরে আসলে তিনি প্রেস ক্লাবের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফলক উন্মোচন করেন। এরপর প্রেস ক্লাবের তৎকালীন সভাপতি আলহাজ¦ অ্যাডভোকেট ইকবাল বিন বাশার ও সাধারণ সম্পাদক জনাব ইকরাম চৌধুরীসহ কয়েকজন নেতৃবৃন্দের নিরলস প্রচেষ্টায় তৎকালীন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী জনাব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার মাধ্যমে ওই মন্ত্রণালয় থেকে ৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়। এই বরাদ্দের অর্থ পরবর্তীতে নিচতলার উন্নয়ন কাজে ব্যয় করা হয়। এ সময় প্রেস ক্লাবের সদস্য জনাব মুনির চৌধুরী ঠিকাদার হয়েও আরো বাড়তি ১১ লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করেন। যে টাকা পেতে তাঁকে ২০১২ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
এরপর ২০১০ সালে তৎকালীন এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাঁদপুর সফরে আসলে আউটার স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত জনসভায় চাঁদপুরে ব্যাপক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেয়ার পাশাপাশি তিনি নিজ থেকেই চাঁদপুর প্রেস ক্লাব ভবনটি বহুতল ভবন করার প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, চাঁদপুর-৩ (সদর-হাইমচর) আসনের সংসদ সদস্য ডাঃ দীপু মনির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রথমে ১৭ লাখ টাকা এবং পরবর্তীতে ৯০ লাখ টাকাসহ মোট ১ কোটি ৭ লাখ টাকা চাঁদপুর জেলা পরিষদের মাধ্যমে বরাদ্দ আসে। চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের ইতিহাসে এটাই সর্বোচ্চ বরাদ্দ। এই বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়েই চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের বর্তমান তিনতলা ভবন নির্মিত হয়। আর সে বছরগুলো হচ্ছে ২০১১ ও ২০১২ সাল। এ বছর দু’টিতে জনাব ইকরাম চৌধুরী, জনাব বিএম হান্নান এবং জনাব কাজী শাহাদাত, জনাব ইকবাল হোসেন পাটওয়ারীর নেতৃত্বাধীন চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের কার্যকরী পরিষদ এই উন্নয়ন কাজে নিরলস পরিশ্রম করে।
এরপর ২০২০ সালে প্রেস ক্লাব ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণে তথা ৪র্থ তলার প্রারম্ভিক কাজের জন্যে চাঁদপুর জেলা পরিষদ থেকে ২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এই অর্থ দিয়ে ৪র্থ তলার পিলার, ছাদ ও দেয়াল নির্মাণ কাজ করা হয়। বাদবাকি কাজ সম্পন্ন করতে আরো অর্থ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেন চাঁদপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ¦ ওচমান গণি পাটওয়ারী।
উল্লেখ্য, প্রেস ক্লাব ভবনটির ৪র্থ তলা করার স্বপ্ন ছিলো ২০২০ সালের কার্যকরী কমিটির সভাপতি জনাব ইকরাম চৌধুরীর। তিনি জীবদ্দশায় এটি দেখে যেতে না পারলেও পরবর্তীতে তাঁর স্থলাভিষিক্ত ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জনাব গিয়াসউদ্দিন মিলন ও সাধারণ সম্পাদক জনাব এএইচএম আহসান উল্লাহ জেলা পরিষদের প্রতিশ্রুত বরাদ্দ প্রাপ্তিতে নিয়মিত যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখেন। ৪র্থ তলা নির্মাণ কাজ শেষ চাঁদপুর প্রেসক্লাবের বর্তমান ভবনটি শতভাগ পূর্ণতা লাভ করে। এর মধ্য দিয়েই চাঁদপুর প্রেসক্লাব অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিক দিয়ে সারা বাংলাদেশের মধ্যে জাতীয় প্রেসক্লাবের পর অনন্য অবস্থানে জায়গা করে নেয়ার গৌরব অর্জন করে। ২০২৫ সালে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন রহিম বাদশা ও সাধারণ সম্পাদক কাদের পলাশ। ২০২৬ সালে সভাপতি সোহেল রুশদী ও সাধারণ সম্পাদক এম. এ. লতিফ দায়িত্ব চলমান রয়েছে।
তথ্যসূত্র : চাঁদপুর প্রেসক্লাবের বিভিন্ন প্রকাশনা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের থেকে প্রাপ্ত তথ্য।